১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের সাত দশক পার হয়ে গেছে। সেই ঘটনার পর বিশ্ব আবারও মুখোমুখি হয়েছে অনেকটা একই ধরনের সংকটের। এবার হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ঘিরে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। প্রশ্ন হলো সাত দশক আগের মতো ঘটনারই কি পুনরাবৃত্তি দেখবে বিশ্ব? 

বিখ্যাত আমেরিকান লেখক ও রম্য রচয়িতা মার্ক টোয়েন ১৮৭৪ সালের উপন্যাস ‘দ্য গিল্ডেড এজ’-এর প্রথম অধ্যায়ে লেখেন, ‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় না, তবে বর্তমানকে প্রায়ই অতীতের ভাঙা টুকরোর ওপর নির্মিত বলে মনে হয়।

’ সুয়েজ সংকটের সময় ব্রিটেন বুঝেছিল, শুধু জোটের ওপর নির্ভর করে তারা আর পরাশক্তির মর্যাদা ধরে রাখতে পারবে না। এখন যুক্তরাষ্ট্রও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি, উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের সামরিক শক্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল বলে মনে হচ্ছে। 

 

১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের উদাহরণ সাম্প্রতিক ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাব্য ফলাফল বোঝার জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। ১৯৫৬ সালের জুলাই মাসে মিসরের নেতা গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন।

এরপর ছয়টি বিমানবাহী রণতরী নিয়ে ব্রিটিশ ও ফরাসি নৌবহর মিশরের বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়। একই সময়ে ইসরায়েলি সেনারা সিনাই উপদ্বীপে মিসরীয় ট্যাংকগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে নাসের তার কৌশলগত শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং মিসরকে বিশাল সাম্রাজ্যবাদের শক্তির সামনে অসহায় মনে হচ্ছিল।

 

কিন্তু ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী সুয়েজ খালের উত্তর প্রান্তে পৌঁছানোর পর গামাল আবদেল নাসের বেশ কয়েকটি পাথর ভরা মরিচা ধরা জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে ভূ-রাজনৈতিক এক মহাকৌশল প্রয়োগ করেছিলেন।

এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারস্য উপসাগরের ইউরোপীয় তেলক্ষেত্রগুলোতে সরবরাহের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিটিশ বাহিনী সুয়েজ থেকে পরাজিত হয়ে পিছু হটে। ততক্ষণে জাতিসংঘে ব্রিটেনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। দেশটির মুদ্রা পতনের দ্বারপ্রান্তে ছিল, বিশ্ববেপী দেশটির সাম্রাজ্যবাদি শক্তির আভা উবে যেতে শুরু করে। 

 

ইতিহাসবিদরা ওই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বলেন, মৃতপ্রায় সাম্রাজ্যগুলো তাদের গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য ছোট আকারের সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে।

একে ‘মাইক্রো-মিলিটারিজম’ বা ‘ক্ষুদ্র-সামরিকবাদ’ বলা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশাল ইউরেশিয়ার ওপর আমেরিকার প্রভাব কিছুটা কমতে দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় ইরানে আমেরিকান সামরিক হুমকি ঠিক এই ধরনের ‘ক্ষুদ্র-সামরিকবাদ’-এর একটি সংস্করণ মনে হচ্ছে।

 

তাহলে কি বলা যায়, ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপ সুয়েজ সংকটের মতোই একটি পুনরাবৃত্তি?  

সুয়েজের চেয়েও বড় বিশৃঙ্খলা

বর্তমান সংকটটি সুয়েজ সংকটের মতো হলেও মাত্রার দিক থেকে তা ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আওতায় ইরানের সামরিক স্থাপনা, পারমাণবিক কেন্দ্র এবং নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকেও হত্যা করা হয়েছে।

পাল্টা জবাবে ইরান উপসাগরজুড়ে আমেরিকান ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান।

জাহাজ-ট্র্যাকিং ডেটা এবং সামুদ্রিক প্রতিবেদন অনুসারে, মার্চের শুরুতেই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেয়। এর ফলে চলাচল ৭০-৯০ শতাংশ বা তারও বেশি কমে গেছে। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যাহত হয়েছে, এটি সুয়েজ সংকটে ক্ষতির দ্বিগুণেরও বেশি। 

১৯৫৬ সালে সুয়েজ সংকটের সময়, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় উৎপাদকদের সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ছিল। সেই অতিরিক্ত সক্ষমতা এখন আর নেই। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছেই অবশিষ্ট অতিরিক্ত ক্ষমতার বেশিরভাগ রয়েছে, কিন্তু তাদের রপ্তানি জলপথের ওপরেই নির্ভরশীল। অথচ তা এখন হুমকির মুখে। 

১৯৫৬ সালে ইউরোপের মতো এবারও এশিয়াকেই সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত তেল ও এলএনজির ৮০ শতাংশেরও বেশি এশিয়ার বাজারে যায়। জাপান তার তেল আমদানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশের জন্য, দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ৬০ শতাংশের জন্য এবং ভারত তার অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেকের জন্য এই প্রণালীর ওপর নির্ভর করে। বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীনও একই পথে তেলের জোগান পেয়ে থাকে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জন্য উপসাগরীয় এলএনজি অনেকটা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মতো।

আমেরিকান ক্ষমতার প্যারাডক্স

যুক্তরাষ্ট্র এখন সুয়েজে ব্রিটেনের মতো একই ধরনের দ্বন্দ্বের সম্মুখীন। একটি শীর্ষস্থানীয় তেল উৎপাদক দেশ হওয়ার পরেও আমেরিকা বৈশ্বিক মূল্যর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে অভ্যন্তরীণ পেট্রলের দাম বেড়ে যায় এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি শুরু হয়। 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে প্রায় ১৯টি ঘাঁটি পরিচালনা করে, যার মধ্যে আটটি স্থায়ী। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কাতারের আল উদেদ বিমান ঘাঁটি। এটি আমেরিকান সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী সদর দপ্তর, প্রায় ১০ হাজার কর্মী কর্মরত। দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এই অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করেছে। সম্প্রতি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বাহারাইনের নৌবহরের সদর দপ্তর এবং আল উদেদসহ আমেরিকার অনেক সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বড় বিমানবন্দর, ঘনবসতিপূর্ণ বিমান ও উন্নত রাডারগুলোও এই হামলার জন্য সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।

ইরান যুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক পরিণতি

ইরানে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবগুলো খতিয়ে দেখলে একটি বিষয় কল্পনা করা সম্ভব। তা হলো, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বেছে নেওয়া এই যুদ্ধটি কীভাবে ওয়াশিংটনের নিজস্ব সুয়েজ সংকটে পরিণত হতে পারে।

১৯৫৬ সালে মিসর সুয়েজ খাল বন্ধ করে দিয়ে সামরিক পরাজয়ের মুখ থেকে কূটনৈতিক বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। এখন ইরানও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। পাঁচটি মালবাহী জাহাজে এবং পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত পেট্রোলিয়াম শোধনাগারগুলোতে ইরান তাদের শাহেদ ড্রোন দিয়ে আক্রমণ করেছে। 

ইরানের ড্রোন হামলায় পারস্য উপসাগরে ৯০ শতাংশের বেশি তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়েছে এবং কাতারের গ্যাস উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বেড়েছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে পারস্য উপসাগর অঞ্চলের জ্বালানি ও সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় মিসরের মতো দেশে ইউরিয়া সারের দাম বেড়েছে, যা বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

অন্যদিকে, সামরিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র চাপে রয়েছে। তাদের ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ সীমিত, বিপরীতে ইরানের সস্তা শাহেদ ড্রোনের সংখ্যা অনেক বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। হোয়াইট হাউজ যুক্তরাষ্ট্রের তাদের বিমান হামলাকে যতটা শক্তিশালী বলে প্রচার করছে, বাস্তবে তা তুলনামূলকভাবে সীমিত। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে ইরানে প্রায় তিন হাজার বোমা হামলা চালানো হলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে চালানো ১৪ লাখ বোমাবর্ষণের তুলনায় তা খুবই কম। তাই কৌশলগতভাবে এ হামলাকে অনেকেই হালকা হিসেবে দেখছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় চার হাজার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যার প্রতিটির দাম প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার এবং দ্রুত উৎপাদন করা কঠিন। বিপরীতে ইরানের কাছে প্রায় ৮০ হাজার শাহেদ ড্রোন রয়েছে, যেগুলো খুব কম খরচে দ্রুত তৈরি করা সম্ভব। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ধীরগতির ড্রোনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পেন্টাগন প্রধান জেনারেল ড্যান কেইন আশ্চর্যজনকভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং শুধু বলেন, ‘আমি পরিমাণ নিয়ে কথা বলতে চাই না।’

শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ৭০ বছর: একই চিত্র, ভিন্ন পদ্ধতি

গত ৭০ বছর ধরে ওয়াশিংটন বিশ্বের পাঁচটি মহাদেশে বারবার শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়েছে। এক্ষেত্রে পদ্ধতি বদলালেও ফলাফল প্রায় একই। বহু দেশ দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে। 

১৯৫৩ সালে ইরানের নতুন পার্লামেন্ট উদীয়মান গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সামাজিক পরিষেবার জন্য তহবিল গঠনের লক্ষ্যে ব্রিটিশ তেল চুক্তি জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরপরই সিআইএ ও এমআই৬-এর যৌথ অভিযানে সংস্কারবাদী প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতাচ্যুত থাকা সাবেক শাহের ছেলেকে ক্ষমতায় বসানো হয়। তবে তিনি অযোগ্য নেতা হিসেবে প্রমাণিত হন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব ঘটে।

১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় সিআইএ-সমর্থিত আগ্রাসনের মাধ্যমে একটি নৃশংস সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর ফলে দেশটি ৩০ বছরের গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের মধ্যে ২ লাখ মানুষ নিহত হয়। 

একইভাবে, ১৯৬০ সালে কঙ্গো বেলজিয়ামের দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে প্যাট্রিস লুমুম্বাকে নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। কিন্তু সিআইএ তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে জোসেফ মোবুতুকে ক্ষমতায় বসায়। তার ৩০ বছরের শাসন ছিল দুর্নীতি ও সহিংসতায় পরিপূর্ণ। এর প্রভাবে দ্বিতীয় কঙ্গো যুদ্ধে (১৯৯৮-২০০৩) ৫০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, যার প্রভাব এখনো অব্যাহত।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে তালেবান সরকারকে উৎখাত করে। পরবর্তী ২০ বছরে ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ে রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা চালানো হলেও ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আবার কাবুল দখল করে। এতে পুরো উদ্যোগ ভেস্তে যায় এবং দেশটি কঠোর পুরুষতান্ত্রিক শাসন ও ব্যাপক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে।

২০০৩ সালে অস্তিত্বহীন পারমাণবিক অস্ত্রের অজুহাতে ইরাকে আক্রমণ চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এতে দেশটি ১৫ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত একটি স্বৈরাচারী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা অনেকাংশে ইরানের ওপর নির্ভরশীল।

পরে ২০১১ সালে ন্যাটোর নেতৃত্বে লিবিয়ায় বিমান হামলার মাধ্যমে মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনের পতন ঘটানো হয়। ফলে দেশটি সাত বছরের গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয় এবং পরে দুটি শত্রুতাপূর্ণ দুর্বল রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

যখন শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে তখন, উল্টো স্বৈরাচারী শাসনকে আরো শক্তিশালী করেছে। যেমন ১৯৬১ সালে কিউবা এবং সাম্প্রতিক সময়ে ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি। এই বাস্তবতা থেকে প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার মার্কিন হস্তক্ষেপের ফলাফল এত হতাশাজনক হয়ে দাঁড়ায়?

ছোট থেকে বড় দৃষ্টিকোণ

প্রায় ৮০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপে ন্যাটো জোট এবং জাপান থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে ইউরেশিয়ার প্রান্তিক অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণ করে বৈশ্বিক প্রভাব ধরে রেখেছিল। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতির বড় অংশ পশ্চিমা গোলার্ধে কেন্দ্রীভূত করায় ইউরেশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে তাদের প্রভাব দ্রুত কমছে। 

ভূ-রাজনীতিবিদ হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডার এবং নিকোলাস স্পাইকম্যান এই অঞ্চলকে ‘রিমল্যান্ড’ বা সংঘাতের কেন্দ্র বলে উল্লেখ করেছিলেন। স্পাইকম্যানের ভাষায়, ‘যে রিমল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করে, সে ইউরেশিয়া শাসন করে, আর যে ইউরেশিয়া শাসন করে, সে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে।’

২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি চালু হওয়ার পর থেকে ইউরেশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো মার্কিন প্রভাব থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপ, রাশিয়া (ইউক্রেনে পশ্চিমাদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে), তুর্কি (যুদ্ধে নিরপেক্ষ), পাকিস্তান (চীনের সঙ্গে মিত্রতা), ভারত (ওয়াশিংটনের কোয়াড জোট থেকে বেরিয়ে) এবং জাপান (স্বায়ত্তশাসিত প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে ফের অস্ত্রসজ্জিত)।

ইরানে চলমান হস্তক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র একসময়ের ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্রদের কাছ থেকে একেবারেই সমর্থন পায়নি। এটি ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ বা ২০০২ সালে আফগানিস্তান অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে গঠিত জোটের সঙ্গে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে। 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের ক্ষুদ্র-সামরিক নীতি মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছে। ইউরেশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস পেয়েছে এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার উত্থানে পথ তৈরি করছে। 

যুক্তরাজ্যে এখনো স্যার অ্যান্টনি ইডেনকে সুয়েজ সংকটের সময়কার অযোগ্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্মরণ করা হয়। তেমনি ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকেও হয়ত সেভাবেই বিচার করতে পারেন। মনে করা হতে পারে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে এই  যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক প্রভাব কমিয়ে ফেলেছেন।

এই পরিস্থিতিতে, মার্ক টোয়েনের সেই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, অতীত প্রায়ই বর্তমানের ঘটনাকে বোঝাতে সাহায্য করে।