সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায়। তবে সংসদের এই অধিবেশনে চিরায়ত দৃশ্য দেখা যাবে না। কারণ অধিবেশনকক্ষে সংসদ সদস্যদের আসনগুলো পূর্ণ থাকলেও স্পিকারের আসনটি থাকবে খালি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদে স্পিকার না থাকায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও উপনেতা কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত দেবেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্পিকার নির্বাচনের পর ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি করা হবে। ওই সময়ে নবনির্বাচিত স্পিকার শপথ গ্রহণ করবেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্পিকারকে শপথ পাঠ করাবেন।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় সংসদ সদস্যদের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যরা পৃথক বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে দলীয় প্রধানরা সংসদ সদস্যদের বিশেষ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি দলের সভায় স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও সংসদ উপনেতা পদে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে স্পিকার পদে আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সংসদ উপনেতা পদে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ বেশ কয়েকজনের নাম এসেছে। আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রীকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর ডেপুটি স্পিকার পদের জন্য বিরোধী দল থেকে নাম প্রস্তাব করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিরোধীদলীয় সূত্রগুলো জানায়, বিদ্যমান সংবিধানে নির্ধারিত ডেপুটি স্পিকার পদটি গ্রহণ করার বিষয়ে সরকারি দলের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে বিরোধী দলের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সেখানে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জুলাই সনদে দুটি ডেপুটি স্পিকারের পদের উল্লেখ থাকলেও বিদ্যমান সংবিধানে একটি ডেপুটি স্পিকারের পদ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আগেই ডেপুটি স্পিকার পদে নাম প্রস্তাব করা হবে কি না, সে বিষয়ে আজ অধিবেশনে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। বিরোধী দলের বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে সংসদে আপত্তি জানানোর প্রস্তাব এসেছে বলে জানা গেছে।
জুলাই সনদ ‘পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে’ই কেবল সংসদের বিরোধী দল ডেপুটি স্পিকারের পদ নেবে বলে জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সংসদ ভবনের এলডি হলে গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘তারা (সরকারি দল) নন-অফিশিয়ালি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, কথা বলেছে, আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই। আমরা চাই, জুলাই সনদের যে সংস্কার প্রস্তাব, সেই প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হোক। এর আলোকে বিরোধী দলের যতটুকু পাওনা, আমরা অতটুকু চাই। বেশি চাই না। জুলাই সনদেই আছে, একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন। আমরা খণ্ডিতভাবে এটা চাচ্ছি না, আমরা চাই পুরো প্যাকেজ। পুরোটাই সেখানে গ্রহণ হোক, বাস্তবায়ন হোক এবং এর ভিত্তিতে আমরা যেন আমাদের ন্যায্য দায়িত্ব পালন করতে পারি।’
রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কটের কোনো আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘হ্যাঁ, এই ব্যাপারে আমরা অনেক আলাপ-আলোচনা করেছি। অধিবেশনে আমাদের ভূমিকা আপনারা দেখবেন। যখন ভাষণ শুনবেন, তখন আমাদের ভূমিকা দেখবেন। বৈঠকে অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত, সেই বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে সংসদ ভবনের এলডি হলে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম জানান, সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় তাঁরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ভবিষ্যতে এটি সংবিধানে যুক্ত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকায় সেশনের শুরুতে একজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হবে। এরপর সংসদ নেতার প্রস্তাবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে কাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন, যা সংসদেই প্রকাশ করা হবে।
চিফ হুইপ বলেন, ‘দীর্ঘ ১৯ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও প্রতীক্ষার পর বৃহস্পতিবার (আজ) থেকে শুরু হচ্ছে নতুন সংসদের যাত্রা। এই অধিবেশনের প্রথম দিনই বিগত সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে পেশ করা হবে। এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কমিটি নির্ধারণ করবে কোন অধ্যাদেশগুলো বহাল থাকবে, আর কোনগুলো ল্যাপস (বাতিল) হবে। এ ছাড়া প্রথম দিনেই সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি, বিশেষ কমিটিসহ কয়েকটি কমিটি গঠন করা হবে। সম্ভব হলে প্রিভিলেজ ও হাউস কমিটিও করা হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও দায়বদ্ধ সংসদ উপহার দিতে চাই। জাতীয় সব সমস্যার সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হবে এই সংসদ। এখানে যুক্তি-তর্ক হবে, গঠনমূলক সমালোচনা হবে। আমরা বিরোধী দলের কাছ থেকেও ইতিবাচক সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।’
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, সংসদ অধিবেশন সামনে রেখে এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করেছে সংসদ সচিবালয়। সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বরাবরের মতো এবারও সংসদের প্রথম অধিবেশন দীর্ঘ হবে, যা আগামী এপ্রিল মাসের শেষ পর্যন্ত চলতে পারে। এই সময়ে প্রধানত রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দীর্ঘ আলোচনা করবেন।
সূত্র আরো জানায়, আজ অধিবেশন শুরু হওয়ার পর সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় দুই দিনের জন্য অধিবেশন মুলতবি হবে। আগামী ১৫ মার্চ সংসদের মুলতবি বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন ও আলোচনা শুরু হবে। এরপর ওই দিন আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অধিবেশন ১৩ দিনের জন্য মুলতবি রাখা হতে পারে। ঈদের ছুটি শেষে আগামী ২৯ মার্চ পুনরায় সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নবনির্বাচিত স্পিকার প্রথম দিনেই বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতার অনুমোদন দেবেন।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলোর বিজয়ী প্রার্থীরা। তবে জুলাই সনদের বিধান অনুযায়ী, তাঁরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। বিদ্যমান সংবিধানে এসংক্রান্ত বিধান না থাকায় তাঁরা ওই শপথ নেননি বলে জানান। তবে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয় দলটি।
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে। আর প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসনে বিজয়ী হয়েছে। প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই সংসদ নেতার আসনে বসবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিপরীতে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসবেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। স্বাধীনতার পর এই প্রথমবারের মতো দলটি সংসদের প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের আসনে বসবেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী দলের ৭৭ জন বিজয়ী প্রার্থী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছেন।
দীর্ঘ দুই যুগ পর সংসদ শক্তিশালী বিরোধী দল পেয়েছে। ফলে অতীতের যেকোনো সংসদের চেয়ে এই সংসদ অনেক বেশি কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর সেটা হলে প্রশ্ন ও উত্তর পর্ব, পয়েন্ট অব অর্ডারের বিষয় থেকে শুরু করে ওয়াক আউট ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রা দেখা যেতে পারে। এরই মধ্যে সংসদ সদস্যদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে দুই দিনব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে বিএনপি। ওই কর্মশালায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ ও এমপিদের সংসদীয় রীতিনীতি ও বিধি-বিধানের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়।


